সফটওয়্যার পাইরেসি বলতে আমরা বুঝি সফটওয়্যার প্রস্তুতকারী কর্তৃক অনুমতি না নিয়েই কোন সফটওয়্যার কপি করা, বিতরণ করা, এর কোন অংশ পরিবর্তন করে নিজের নামে চালানো। অন্যের জিনিস চুরি করার মতো সফটওয়্যার পাইরেসি করাও একটি অপরাধমূলক কার্যক্রম। ২০০৮ সালে বিজনেস সফটওয়্যার এলিয়েন্সের করা এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে ঐ বছর সফটওয়্যার পাইরেসির পরিমাণ ৪১% বৃদ্ধি পায় এবং যা হতে ক্ষতির পরিমাণ দ্বারায় ৫০.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা ২০০৯ সালে এসে বৃদ্ধি পায় প্রায় ৯১%। আমাদের দেশের অধিকাংশ ব্যবহারকারীরা পাইরেটেড বা পাইরসি সফটওয়্যার ব্যবহার করে।

একটি সফটওয়্যার তৈরি করতে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্টানকে বা তাদের প্রোগ্রামার ও ডেভলোপারদের যথেষ্ট পরিমাণ শ্রম ও সময় দিতে হয়। সফটওয়্যার পাইরেসির কারণে সফটওয়্যার প্রস্তুতকারী আর্থিকভাবে বিপুল পরিমানে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সফটওয়্যার পাইরেসির ফলে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্টান বা প্রোগ্রাম ও ডেভলোপাররা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার ফলে তারা সফটওয়্যার তৈরি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ফলে ভালমানের সফটওয়্যার তৈরি হয় না এবং ক্রেতা-বিক্রেতাসহ অন্যরাও এধরনের আইন বিরুধী কাজে লিপ্ত হয়। তাই একে আজ অনেক বড় ধরনের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং সফটওয়্যার পাইরেসি প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশও তাদের সংবিধানে শাস্তির বিধান রাখে।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কপিরাইট ‘ল’ এবং আইপিআর (ইন্টেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইট) প্রচলিত আছে। বাংলাদেশে কপিরাইট ‘ল’ ১৯৭৪ সালে গঠিত হয় এবং পরবর্তীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে নতুন করে ২০০০ সালে এ আইন করা হয়, যা ২০১৫ সালে সংশোধন করা হয়। এই আইনের মাধ্যমে সফটওয়্যার পণ্যকে অন্যান্য পণ্যের ন্যায় বাজারজাতকরণ এবং উৎপাদনের সকল অধিকার প্রোগ্রামার ও ডেভলোপারদের দেওয়া হয় এবং সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে এই আইনের প্রচলন ও সচেতনার অভাবে দিন দিন সফটওয়্যার পাইরেসি আকার ব্যপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

Software Piracy - www.answerandsolution.com

আমাদের দেশে বিশেষ কিছু ক্ষেত্র ছাড়া প্রায় সকল ক্ষেত্রে পাইরেটেড সফটওয়্যার ব্যবহৃত হচ্ছে। আর এর ফলে একদিকে আমরা কপিরাইট আইন ভংঙ্গ করছি অন্য দিকে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি।

নিচে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সফটওয়্যার পাইরেসির ধরণ দেওয়া হলো:

 ১.  আপলোডিং ও ডাউনলোডিং: ইন্টারনেটের মাধ্যমে কপিরাইটকৃত সফটওয়্যার বিনা অনুমতিতে ডাউনলোড করা বা বিতরণ করা কপিরাইট আইনের লংঘন।

 ২.  সফটওয়্যার নকল: কোন প্রতিষ্টানের তৈরি করা সফটওয়্যারের কোন অংশ পরিবর্তন করা বা নিজের বলে বিক্রয় করা কপিরাইট আইনের লংঘন।

 ৩.  সফট লিফটিং: লাইসেন্সকৃত সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে নিজে ব্যবহার করা ছাড়াও অন্যদের অর্থাৎ আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব লাইসেন্স প্রদান করা।

 ৪.  সফটওয়্যার পুন:বিক্রয়: প্রস্তুতকারী কর্তৃক অনুমতি না নিয়েই সফটওয়্যার পুনরায় অন্যের নিকট বিক্রয় করাও কপিরাইট আইনের লংঘন।

 ৫.  হার্ডডিস্ক লোডিং: একাধিক লাইসেন্সকৃত সফটওয়্যার দ্বারা হার্ডডিস্ক পূর্ন করে পুন:বিক্রয় করা কপিরাইট আইনের লংঘন।

 ৬.  ভাড়া দেওয়া: লাইসেন্সকৃত সফটওয়্যার অন্যের নিকট ব্যবহারের জন্য ভাড়া দেওয়া।

পাইরেটেড সফটওয়্যার ব্যবহারের ফলে ইউজার বা ব্যবহারকারীরা কিভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে:

পাইরেটেড সফটওয়্যার সহজলভ্য হওয়ায় হয়তো আমরা অনেকেই ব্যবহার করি কিন্তু এর ফলে আমরা অনেকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারি। সে রকম কিছু ক্ষতিরকারণ বিষয় নিচে দেওয়া হলো:

 ১.  পাইরেসি সফটওয়্যার ব্যবহার করার মাধ্যমে কপিরাইট আইন লংঘন করার ফলে আপনি শাস্তির আওতায় পড়তে পারেন যা আপনার জন্য সন্মান সূচক হবে না। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্থ প্রতিষ্টান আপনার বিরুদ্ধে মোকদ্দমা দায়ের করতে পারে ফলে দেশের আইন-কানুন অনুযায়ী আপনাকে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে।

 ২.  পাইরেটেড বা পাইরেসি করা সফটওয়্যারে অনেক সময় বিভিন্ন ধরণের ক্ষতিকারক প্রোগ্রাম থাকে ফলে আপনার ব্যবহৃত কম্পিউটার সিস্টেম ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে।

 ৩.  পাইরেটেড বা পাইরেসি সফটওয়্যার ব্যবহারের ফলে আপনার অনেক গুরুত্বপূর্ন তথ্য বা ডেটা হ্যাকারদের হাতে চলে যেতে পারে।

 ৪.  পাইরেটেড বা পাইরেসি সফটওয়্যার ব্যবহারের ফলে আমরা যেমন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছি তেমনি আমাদের দেশের সফটওয়্যার বা প্রোগ্রামাররা সফটওয়্যার তৈরিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে ফলে আমাদের দেশে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ব্যাহত হচ্ছে।

 ৫.  এধরণের সফটওয়্যার ব্যবহারের ফলে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্টান ছাড়াও সরকার বিপুল পরিমাণে রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যা আঞ্চালিক উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারতো।

 ৬.  সফটওয়্যার পাইরেসি বা পাইরেটেড সফটওয়্যার ব্যবহারের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পাইরেসির ফলে সফটওয়্যার বিষয়ক প্রতিষ্টানে শত শত পদ বিলুপ্ত হয়, ফলে এর প্রভাব সাধারন মানুষের উপরও পড়ে।

সফটওয়্যার পাইরেটেড বা পাইরেসি প্রতিরোধের উপায়:

পাইরেসি বা পাইরেটেড করা মানে হলো চুরি করা। এর কারণে সফটওয়্যার প্রতিষ্টানগুলো আর্থিকভাবে ব্যপকহারে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এ থেকে বাচার উপায়:

 ১.  জনসচেতনা বৃদ্ধি: সফটওয়্যার পাইরেসি সম্পর্কে আমাদের দেশের অনেকের সুস্পষ্ট ধারণা নেই। পাইরেসি কি? পাইরেসির কারণে কি কি কুফল হতে পারে তা জনগণকে বোঝাতে হবে। অর্থাৎ একমাত্র জনসচেতনাই পারে পাইরেসি প্রতিরোধ করতে।

 ২.  কপি-রাইট প্রটেক্ট করা: সফটওয়্যার তৈরি করার সময় কপি-রাইট প্রটেক্টেরমত ব্যবস্থা করা গেলে পাইরেসি অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। যেমন: এন্টিপাইরেসি সফটওয়্যার ব্যবহার করা, ইন্টারনেটের মাধ্যমে লাইসেন্সের অথেন্টিকেশন করা ও হার্ডওয়্যার কী লকের মত সিস্টেমের ব্যবহার করা।

 ৩.  আইনের প্রয়োগ: কপি রাইট সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে। প্রয়োজন হলে কপিরাইট ‘ল’ এবং আইপিআর (ইন্টেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইট) আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে ও আইন ভংঙ্গকারী শাস্তির আয়ওতায় নিয়ে আসতে হবে।

পরিশেষে আমরা বলতে পারি সফটওয়্যার পাইরেসির মত অপরাধ থেকে আমরা নিজেকে সুরক্ষিত রাখি ও নতুন নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নে প্রোগ্রামার ও ডেভলোপারদের উৎসাহ প্রদান করি।

শেয়ার করুন!

লেখক সম্পর্কে:

স্বাগতম! মো: নাজমুল ইসলাম একজন ওয়েব ডেভলোপার। আমি দীর্ঘদিন ধরে ওয়ার্ডপ্রেস, পিএইচটি, পাইথন ও অন্যান্য প্রোগ্রামিং ভাষা নিয়ে কাজ করছি। এই ওয়েব সাইটে আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে আপনাদের জন্য বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সেরা কন্টেন্ট লিখব ইনশাআল্লাহ!

আপনার মতামত লিখুন!

Your email address will not be published. Required fields are marked

{"email":"Email address invalid","url":"Website address invalid","required":"Required field missing"}
error: বিষয়বস্তু কপিরাইট সুরক্ষিত !!