আদিমকালে মানুষ নানাভাবে তাদের প্রয়োজনীয় হিসেব নিকেশ করতেন কেউ দাগ টেনে, কেউ আংঙ্গুলের মাধ্যমে, আবার কেউ পাথর দিয়ে। যা সংরক্ষণের কোন উপায় ছিল না বললেই চলে। কিন্তু কালের বিবর্তনে মানুষ আজ পেয়েছে অনেক অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, যা দিয়ে সবচেয়ে কঠিন ও জঠিল সব হিসেব করা যায় ও প্রয়োজনে তা সংরক্ষণ করাও যায়। সভ্যতা যতই এগিয়ে গিয়েছে মানুষের ততই অঙ্ক করার কলাকৌশলের প্রয়োজন হয়েছে বা অভাব দেখা দিয়েছে, দেখা দিয়েছে নতুন নতুন চাহিদার। তাই বিভিন্ন সময়ে মানুষ অঙ্ক কষার বিভিন্ন উপায় বা কলা-কৌশল রপ্ত করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আবিষ্কার হয় অ্যাবাকাস, নেপিয়ারের অস্থি, স্লাইডরুল, প্যাস্কেলের যন্ত্র, মেকানিক্যাল ক্যালকুলেটর, জ্যাকুয়ার্ড ও তার পাঞ্চকার্ড এবং সর্বশেষে অত্যাধুনিক Computer প্রযুক্তি। যার মূলে রয়েছে মানুষের বিভিন্ন ধরনের হিসেব-নিকেশ ও নানা ধরনের গবেষণামূলক কাজ।

কম্পিউটার আবিষ্কারের ইতিহাস:

কম্পিউটার নামক এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিটির আবিষ্কার একদিনে বা রাতারাতি হয় নি, এর জন্য গবেষকদের করতে হয়েছে অক্ল্যান্ত পরিশ্রম, দিতে হয়েছে অনেক ত্যাগ। সভ্যতার উন্নতির সাথে সাথে মানুষের বিভিন্ন বিষয়ের চাহিদা তৈরি হয়, প্রয়োজন পড়ে লেনদেনের। এর ফলে দেখা দেয় নতুন আরেক চাহিদা, লেনদেনের হিসেব-নিকেশ করা ও তা সংরক্ষণের উপায় অনুসন্ধান করা। মানুষ প্রথমে হাতের আঙ্গুল, পাথর-নুড়ির ব্যবহার, ঝিনুকের ব্যবহার ও দড়ির গিটের মাধ্যমে তাদের প্রয়োজনীয় হিসেব করত। কিন্তু দিন দিন সভ্যতার উন্নতিতে হিসেব-নিকেশ জঠিল ও কঠিন হতে থাকে।  

এরই ধারাবাহিকতায় আনুমানিক খৃষ্টপূর্ব ৫০০০ বছর পূর্বে আবিষ্কার হয় অ্যাবাকাস নামক যন্ত্র। ধারনা করা হয় চীন দেশের মানুষদের মাঝে এর ব্যবহার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পরে। শুরুর দিকে রাজকীয় ও রাজস্ব আয়-ব্যয়ের হিসেবের কাজে ব্যবহার করা হতো এই অ্যাবাকাস (Abacus)।

এরপর ১৫৫০-১৬১৭ সালের মধ্যে আবিষ্ককার হয় নেপিয়ারের অস্থি। ১৬২২ সালে জার্মানীর বিজ্ঞানী উইলিয়াম অট্রেড বৃত্তাকার স্লাইডরুল। এরপর ফরাসি বিজ্ঞানী ব্লেইজ প্যাসক্যাল ১৬২৩-১৬৬২ সালে চাকার সাহায্যে চলে এমন গননা যন্ত্রের আবিষ্কার করেন। তার নামনুসারে এই যন্ত্রের নাম হয় প্যাস্কেলের যন্ত্র এটি দিয়ে গুন, ভাগ, যোগ, বিয়োগ ও গুনফল নির্ণয় করা যেত এবং এটিই হচ্ছে বর্তমান আধুনিক যুগের বাণিজ্যিক ক্যালকুলেটরের আদি রুপ। এরও অনেক পরে ১৬৭৪ সালে আবিষ্কার হয় পৃথিবীর প্রথম ডিজিটাল মেকানিক্যাল ক্যালকুলেটর Stepped Reckoner।

১৮০১ সালে ফ্রান্সের যোসেফ মেরি জ্যাকুয়ার্ড ও পাঞ্চকার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে বুনন কাজে কি ধরনের নকশা করা হবে তা নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র জ্যাকুয়ার্ড লুম আবিষ্কার করেন। এতে পাঞ্চকার্ডের মাধ্যমে নকশা সংরক্ষণ করে রাখার ব্যবস্থা ছিল। বস্ত্র শিল্পে ব্যবহৃত পাঞ্চ কার্ডের ধারণা থেকে এর প্যাটার্ন পরির্বতন করে পরবর্তীতে কম্পিউটারে স্বয়ংক্রিয় হিসেব করার কাজে এই ধরনের সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। এরপর ১৮২০ সালে আবিষ্কার হওয়া টমাস এরিথোমিটার নামের হস্তচালিত মেকানিক্যাল ক্যালকুলেটর প্রায় ৯০ বছর বাজারে বিক্রি হয় এই ক্যালকুলেটর। ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চার্লস ব্যাবেজ ১৮২২ সালের দিকে ব্রিটিশ সরকারের অনুদানে “ডিফারেন্স ইঞ্জিন” বা বিয়োগ ভিত্তিক গননা যন্ত্রের আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে অনুদান বন্ধ হয়ে গেলে এ গরেষনা আর এগোই নি। 

চার্লস ব্যাবেজ আবারও ১৮৩৩ সালে “এ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন” নামক আরও একটি যন্ত্র আবিষ্কারের চিন্তা-ভাবনা করেন। এই এ্যানালিটিক্যাল যন্ত্রেই আধুনিক কম্পিউটারের অনেক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল। তিনি স্মৃতিভান্ডারের মতো তথ্য সংরক্ষণের চিন্তা-ভাবনা তখনেই করেছিলেন। চার্লস ব্যাবেজ এর চিন্তাভাবনা ও গবেষনাই পরবর্তীতে কম্পিউটার প্রযুক্তি উন্নয়ণে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছিলো, এজন্যই চার্লস ব্যাবেজ কে কম্পিউটারের জনক বলা হয়। ১৯৩৭ সালে র্হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আইকেন হলোরিথের পাঞ্চকার্ড প্রযুক্তির সাথে বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক প্রযুক্তিগত সমন্বয় ঘটিয়ে স্বয়ংক্রিয় গননা যন্ত্র আবিষ্কারের গবেষনা শুরু করেন। 

এরই ধারাবাহিকতায় আইবিএম কোম্পারির সহায়তায় ১৯৪৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথিবীর প্রথম কম্পিউটার তৈরি করা হয়। চার্লস ব্যাবেজ এর এ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিনের এটি ছিল আধুনিক রুপ। এর নাম করণ করা হয় ASCC (Automatic Sequence Controlled Calculator)। একে মার্ক-১ কম্পিউটারও বলা হয়। এভাবেই পৃথিবীতে আধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তির সূচনা হয়।

Computer বিবর্তনের ইতিহাস:

Old computer

মার্ক-১ কম্পিউটার আবিষ্কারের মাধ্যমে শুরু হয় কম্পিউটার প্রযুক্তির যাত্রা। এরপর দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে কম্পিউটার প্রযুক্তির। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় জার্মানদের যোগাযোগের তথ্য রিসিভ করে অর্থ উদ্ধার করতে “টমি ফ্লাওয়ার্স, এ্যালেন কোম্বস, হেরি ফেনসম” ইত্যাদি গবেষগ অক্লান্ত পরিশ্রম করে তৈরি করেন Colossus কম্পিউটার। Colossus কম্পিউটার হলো পৃথিবীর প্রথম প্রোগ্রাম চালিত কম্পিউটার। এরপর ১৯৪৬ সালে “এনিয়াক” (Electronic Numerical Integrator and Calculator-ENIAC) কম্পিউটার তৈরি করা হয়। ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ নির্ধারণে এটি ব্যবহার করা হতো।

১৯৪০-১৯৫০ এর দশকে হাঙ্গেরীয় বিখ্যাত বিজ্ঞানি জন ভন নিউম্যান বলেন “বাইনারি সংখ্যা পদ্ধতি ব্যবহার করে স্মৃতি ব্যবস্থা সম্পন্ন কম্পিউটার তৈরি করা সম্ভব”। পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মরিস উইলকিস ১৯৪৯ সালে সর্বপ্রথম বিজ্ঞানি নিউম্যান এর ধারণা কাজে লাগিয়ে এডস্যাক কম্পিউটার অর্থ্যাৎ (Electronic Delayed Storaged Automatic Computer-EDSAC) তৈরি করেন।

বাইনারি ভিত্তিতে প্রথম কম্পিউটার তৈরি হয় নিউম্যান ধারণা থেকেই, এজন্য বিজ্ঞানি নিউম্যানকে আধুনিক কম্পিউটারের জনকও বলা হয়। এরপর ১৯৫১ সালে Remington Rand নামক একটি কোম্পানি UNIVAC কম্পিউটার তৈরি করেন। UNIVAC প্রতি সেকেন্ডে ৮৩৩৩ বার যোগ ও ৫৫৫ বার গুনন করতে সক্ষম ছিলো। UNIVAC-ই হচ্ছে ব্যণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদিত প্রথম ডিজিটাল কম্পিউটার।

এর পরবর্তী সময়ে বিশ্বে ১৯৪৮ সালে ও ১৯৫৮ সালে ট্রানজিষ্টর ও আইসি(IC) আবিষ্কার হলে পূর্বের কম্পিউটারের চেয়ে আধুনিক কম্পিউটারগুলো আকারে ছোট ও অনেক শক্তিশালী হতে থাকে। কম্পিউটার প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বিপ্লব ঘটে ১৯৭১ সালে মাইক্রোপ্রসেসর আবিষ্কারের মাধ্যমে।

আমেরিকার ইন্টেল (Intel) কোম্পানি তৈরি করেন ৪০৪০ নামের প্রথম মাইক্রোপ্রসেসর। কম্পিউটারে মাইক্রোপ্রসেসর ব্যবহার করার ফলে কম্পিউটার তৈরিতে ব্যায় অনেক কমে যায় ও আকারে একটি টেলিভিশনের সমান হয়ে যায় এবং এর ফলে কম্পিউটারের ব্যবহার ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেক বেড়ে যায়।

মাইক্রোপ্রসেসর তৈরি করা কম্পিউটারকে পার্সোনাল কম্পিউটার বলা হয়। আকারে ছোট ও ব্যবহারে পূর্বের কম্পিউটারের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে যাওয়া এবং সেই সাথে কম্পিউটার উৎপাদন ব্যয় অনেক কমে যাওয়ার ফলে এটি ব্যবহারে দিন দিন জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। এভাবে অনেক গবেষণা ও বিজ্ঞানিদের অক্ল্যান্ত পরিশ্রমের ফলেই আজ আমরা পেয়েছে অত্যাধুনিক সব কম্পিউটার।

কম্পিউটারের ধরণ:

আমরা সচারেচর যে ধরনের কম্পিউটার ব্যবহার করি সেটিই শুধু কম্পিউটার নয়। কম্পিউটারের কিন্তু আরও ধরণ আছে, আবার কাজের উপর ভিত্তি করে কম্পিউটারের অনেক প্রকার রয়েছে। কম্পিউটার সাধারনত দুই প্রকার:- ১. অ্যানালক কম্পিউটার ও ২. ডিজিটাল কম্পিউটার।

অ্যানালক Computer:

ঘড়ির কাটার ন্যায় বা পরিবর্তনশীল রাশির উপর ভিত্তি করে যে কম্পিউটার কাজ করে, তাই হচ্ছে অ্যানালক কম্পিউটার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়: গাড়ির গতি পরিমাপক যন্ত্র, তাপমাত্রা পরিমাপক যন্ত্র থার্মোমিটার, অ্যামোমিটার, ভোল্টমিটার, ট্যাকোমিটার ইত্যাদি। এগুলো বিভিন্ন গবেষণা মূলক কাজে ব্যবহার করা হয়।

ডিজিটাল Computer:

ডিজিটাল কম্পিউটার বলতে ডিজিট বা সংখ্যার উপর ভিত্তি করে অর্থাৎ বাইনারি সংখ্যা ০ ও ১ উপর ভিত্তি করে বা উপস্থিতির উপর নির্ভর করে যে কম্পিউটার কাজ করে তাকেই ডিজিটাল কম্পিউটার বলা হয়। বাইনারি সংখ্যা ০ ও ১ এর উপস্থিতির ভিত্তিতে এই কম্পিউটার কাজ করে বলে এ ধরনের কম্পিউটারের হিসেব বা কার্যক্রম সঠিক ও নির্ভূল হয়।

শেষ কথা:

আমরা এই অ্যার্টিকেলের মাধ্যমে Computer আবিষ্কারের কিছু তথ্য তুলে ধরেছি। সেই সাথে কম্পিউটার আবিষ্কারে অবদান রেখেছেন এমন কিছু সেরা বিজ্ঞানীদের তুলে ধরেছি। আমরা এই বিষয়গুলো সংগ্রহে বিভিন্ন বই ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সূত্রের সহায়তা নিয়েছি। আশা করছি পাঠক মহাদ্বয়ের কাছে আমাদের লেখাটি পছন্দ হবে।

শেয়ার করুন!

লেখক সম্পর্কে:

স্বাগতম! মো: নাজমুল ইসলাম একজন ওয়েব ডেভলোপার। আমি দীর্ঘদিন ধরে ওয়ার্ডপ্রেস, পিএইচটি, পাইথন ও অন্যান্য প্রোগ্রামিং ভাষা নিয়ে কাজ করছি। এই ওয়েব সাইটে আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে আপনাদের জন্য বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সেরা কন্টেন্ট লিখব ইনশাআল্লাহ!

আপনার মতামত লিখুন!

Your email address will not be published. Required fields are marked

{"email":"Email address invalid","url":"Website address invalid","required":"Required field missing"}

আমরা প্রাই সকলেই জানি কম্পিউটার হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও আধুনিকতম যন্ত্রপ্রযুক্তি। যা ...

আরও পড়ুন
error: বিষয়বস্তু কপিরাইট সুরক্ষিত !!